বহুদিন পরে এল একটা কাজ, সাথে নিয়ে এল এই পাথরের ঘরের এই হাড় জমানো
ঠাণ্ডাতেও বেশ একটা গরম গরম অনুভূতি। কাঠের বিছানার একপাশে রাখা থলিটা। তুলে দেখলাম বেশ ভারী প্রায় গোটা পঁচিশ হবেই
মোহরের সংখ্যা। ভাবছি এতগুলো যখন মোহর, কাজটা কিরকম?
আগন্তুক বসে আছে সামনে, পুরোপুরি আলখাল্লা ঢাকা শরীর। মাথায় কাপড়
জড়ানো তারই একটা প্রান্ত টেনে মুখেও জড়ানো।
কে হতে পারে? কথার ধরনে বুঝতে পারছি সবই জানে আমার
সম্বন্ধে। একটু অস্বস্তিও কাজ করছে মনে, আসল উদ্দেশ্যটা
যতক্ষন না বুঝতে পারছি।
কিন্তু বেশ কিছুদিন ভালো
মন্দ খাইনি, ঘরেও নেই কিছু তেমন পড়ে।
মোহরগুলো কাজে লাগবে বেশ কটা দিন। অনেকদিন ভাটিখানাও যাইনি। যা আছে ধরে খরচ করলে
আপাতত এক বছর নিশ্চিন্ত। পঁচিশটা মোহর অনেকটা অর্থ।
কাজটা যায় হোক, করতেই হবে...
বিশেষ কিছু না বলেই উঠে
চলে গেল আগন্তুক, বলল
দেখা করতে নগরের শেষ মাথায়, সূর্য্য যখন ঠিক উঠবে মাথার উপরে,
ঠিক তখনই যেতে হবে যেখানে ঘোড়ার আস্তাবল রয়েছে।
আমিও উঠে পড়লাম, গতরাতের শক্ত হয়ে যাওয়া মোটা রুটি পড়ে ছিল, গরম
জলে সবজি সেদ্ধ করে রুটি ভিজিয়ে খেয়ে নিলাম।
গোপন কুঠুরি থেকে বের
করলাম অস্ত্রগুলো। সবচেয়ে প্রিয় আমার ছোট ছুরিটা, সবচেয়ে বেশি রোজগার দিয়েছে এটাই, তাই
হাতির দাঁতের কারুকাজ করা বাঁট লাগিয়েছি। এক আঙ্গুল ফলা ইস্পাতের, সিন্ধুন্দির পারের ভারত থেকে আনা ইস্পাত। খুব সরু কিন্তু শক্ত আর দুদিকেই
দাঁত রয়েছে। সব সময়ের সাথী এটা, পাথরে ঘষে মেজে ধার করে
নিলাম, গত রাতের প্রদীপের তেল দিয়ে মেজে রেখে দিলাম। বাকি
অস্ত্রগুলো আরেকবার দেখে রেখে দিলাম চামড়ার ব্যাগে।
আলখাল্লাটা পরে নিলাম, ঢাকা শরীর, ছোট
তরোয়াল'টা সাথে নিয়ে নিলাম, এই
আলখাল্লায় অস্ত্রটা ভালো করে লুকিয়ে নিলাম। ছোট ছুরিটা নিলাম সাথে বরাবরের মতোই।
প্রথমেই গেলাম অনুবিস
মন্দিরে, বিশাল মন্দির নীল নদের ধারে, সিঁড়িগুলি বেশ চওড়া। উপরে উঠলে দারুন দেখায় নীল নদ। বিশাল দেবতার বড় বড়
কান। সোনায় বাঁধানো। ঝকঝক করছে প্রদীপের আলোয়। দেখলে ভয়ের সাথে ভক্তি আসতে বাধ্য।
ধন্যবাদ প্রার্থনা জানালাম এমন একটা ভালো কাজ দেবার জন্য। এখানে আসার আগে লাউৎ
ছিলেন আমার প্রিয় দেবী যদিও, তবে অনুবিস নামের এই শেয়াল
মাথার দেবতার কাছে অসম্ভব ঋণী আমি, যখনই কিছু মানত করেছি
আমায় ফেরান নি।
আজ মন খুব ফুরফুরে...
কিনে নিলাম একটা নতুন
জলের বোতল, মাটির বোতলগুলো ভেঙে
যায় তাই কিনলাম একটা চামড়ার ছোট জলের বোতল। অনেকদিনের ইচ্ছে ছিল আর এটা চট করে
ভেঙেও যায় না। সরাইখানায় গিয়ে পেট ভরে ভালো করে খেয়ে নিলাম মাংস আর রুটি। কিছু
খেজুর কিনে নিলাম, সন্ধ্যের জন্য।
চলেছি আস্তাবলের দিকে, আশেপাশের ঘরগুলো বেশ সুন্দর, এদিকটা সম্ভ্রান্ত লোকেদের ঘরবাড়ি। বড় বড় বহুতল। আরেকটু এগুতেই এল ফারাও
এর প্রাসাদ। বেশ বড় ফটক। মূল দরজার আগে এটা একটা সাধারণ ফটক।
এখান থেকে নির্দেশ গেলে
তবে মূল ফটকের দরজা খুলবে। বেশ কড়া পাহারা।
আমার ঘর একদমই দরিদ্র
অঞ্চলে, মুচি জেলে কসাই মেথর কুমোর আর কয়েকঘর ছুতর
সবাই মিলে বাস। সবার ঘর পাথরের, নামেই ঘর, আসলে প্রাসাদের বেঁচে যাওয়া ছাঁট পাথর গুলো কাদা দিয়ে জুড়ে জুড়ে ছোট ছোট
কুঠুরি। গরমে তাও চলে যায়, ঠান্ডায় বড়ই কষ্ট। আমার ঘরটা আরও
একটু দূরে বাকি সবার ঘর থেকে। ঘরে রাতের মরুভূমির বাতাসটা বেশ কষ্টের।
যদিও আমার আসল ঘর লাউৎ
দেবীর জায়গায়, এখানে এসেছি দুইটা
শীত পেরিয়ে গেল।
একটা ভালো পশমের চাদর
কিনলাম একটা ফেরি ওয়ালার কাছ থেকে। বেশ মোটা আর মোলায়েম যদিও আধা মোহর গেল। সে যাক
এটা অন্তত আরো পাঁচটা টা শীত কাজে দেবে।
যদিও জানিনা কদিন এখানে
থাকব। জানিনা আবার যেতে হবে কোথায়...
নগর ছাড়িয়ে একটু খালি
খালি অঞ্চল শুরু হল। এরপর খালি মাঠ। ওই যে দূরে দেখা যায় আস্তাবল। আস্তাবলের ওপারে
পশ্চিম দরজা। মূলতঃ ব্যবসায়ীদের জন্যই এই দরজা টা।
হটাৎ শুনলাম একটা মৃদু
কিন্তু তীব্র সিস। তাকিয়ে দেখি সেই আগন্তুক। চোখের ইশারা করে এগিয়ে গেল। আমি চললাম
পিছু পিছু দূরত্ব রেখে।
আস্তাবলের থেকে বেশ
কিছুটা দূরে রয়েছে পুরোন আস্তাবল। এখন পরিত্যক্ত। পাথরের একটা ভাঙা ঘর। ওখানে গিয়ে
দাঁড়ালাম দুজনে। আগন্তুক চারপাশ দেখে এল। কেউ নেই।
কাজটা বুঝলাম, কিভাবে করতে হবে সেটাও বলে দিল। আমায় দিল
ছোট্ট একটা নল। বলল এখানে কেউ চেনে না এই অস্ত্র।
কিন্তু আমি চিনি, ব্যবহার ও করেছি আগে। এটা আফ্রিকার
বাতাস-নল। ছোট বিষ মাখানো তির ভেতরে ভরে মুখে হাওয়া ভরে ছুঁড়লে বিষক্রিয়ায় মৃত্যু
হবে খুব দ্রুত।
গোটা কুড়ি তির আর বিষও
দিল পাথরের কৌটোয় ভরে।
কাজটা হল ফারাও এর
নাবালক ছেলেকে খুন করতে হবে। শুনে মনটা কেমন হয়ে গেল ওইটুকু বাচ্ছা কে খুন।
আগন্তুক বুঝে নিয়েছে
আমার দোটানা। আরো দশটি মোহর দিল ।
আবার এটাও বলল তোমায়
গুপ্তচর বাহিনীর প্রধান করে দেব যদি আমি হই ফারাও।
ও তাহলে এই হল ছক।
পরিচয় জানতে চাইলাম কে
এই আগন্তুক। মুখের কাপড় সরাল আগন্তুক। আরে এ তো ফারাও এর খুব কাছের লোক। সম্ভবত ওর
বৈমাত্রেয় ভাই।
খুব দ্রুত সেই ছুরিটা
ধরে নিলাম। মুখে বললাম আরো পঁচিশ মোহর লাগবে। শুনে একটু ইতস্তত বোধ করতে লাগলো।
কিন্তু কথা না বাড়িয়ে সে গোপন পকেট থেকে মোহর বের করবার জন্য যেই ঝুঁকল, ছুরিটা চালিয়ে দিলাম গলায়। শ্বাসনালী
দুভাগ। আরো একবার উল্টোদিকে চালিয়ে দিলাম আর তারপর আবার আরেকবার একটু খানি।
দুইপাশের শিরা কেটে গেল। এইভাবে আড়াই প্যাঁচে খুন করলে পাপ লাগবে না, লাউৎ এর দিব্বি, দেবী খুব খুশি হবেন।
এদেরকে খুব চিনি, দুমুখো সাপ। কাজ শেষ হবার সাথে সাথে এই খুন
করবে আমায় সবার আগে। কোন পিছুটান কোন প্রমাণ রাখবে না।
ফারাও খুব ভালো কাজ
করেছেন, সবার কথা ভাবেন, নীল
নদের আশীর্বাদে বহুদিন পরে আসেন এমন ফারাও, এমন মানুষের সাথে
বিশ্বাসঘাতকতা
অনুবিস সহ্য করবেন না।
মোহর নিয়ে দেহটা পুরোন
পাথরের মধ্যে লুকিয়ে ফেললাম, এমনিতে
কেউ দেখতে পাবে না শুধু রাত্রে শেয়ালদের চোখে না পড়লেই হল, তবে
দেহ বের করতে পারবে না।
ফেরার সময় দেখলাম বৃদ্ধ
ফারাও বেরিয়েছেন নগর পরিক্রমায়। সাথে নাবালক ছেলেটিও রয়েছে। ওনারা জানেনও না আজ
অনুবিস এর দয়ায় ওনারা বিপন্মুক্ত, নাহলে
আজ এই বিষ তির ছোট ছেলেটির গলায় বিঁধত। আলখাল্লার ভেতরে সেই নলটি তার অস্তিত্ব
এখনো জানান দিচ্ছে। ভিড় করে রয়েছে নাগরিকরা, রাস্তার ধারে
ধারে। একটা উঁচু জায়গা দেখে আমিও দাঁড়ালাম, বৃদ্ধ ফারাও এর
সাথে চোখাচুখি হতে উনি হাসলেন, মনে হল যেন আমার স্বর্গত পিতা
আশীর্বাদ করলেন।
#লাউৎ - সেই সময়ের
মরুভূমির দেবী, মরুভূমির জনগোষ্ঠীর উপাস্য।
।। সমাপ্ত ।।
| Aleekpatamagazine.blogspot.in |
| Editor: Swarup Chakraborty | Publisher: Debasree Chakraborty |
|ALEEK PATA-The Expressive World |Online Magazine |
|a DISHA-The Dreamer Initiative |
|Special Puja Issue,2019 | September-October, 2019 |
| Third Year Third Issue |20Th Edition|
No comments:
Post a Comment
Please put your comment here about this post